একসময় বর্ষা এলেই নারায়ণগঞ্জ শহরজুড়ে শুরু হতো জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ। ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতেই চাষাঢ়া, গলাচিপা, ২নং রেলগেইট, বঙ্গবন্ধু সড়ক, ডিআইটি, কালীরবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমে যেত। যান চলাচল ব্যাহত হতো, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ত, চরম ভোগান্তিতে পড়তেন পথচারী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ। তবে চলতি বর্ষা মৌসুমে টানা দুদিনের বৃষ্টির পরও শহরের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা না থাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে নগরবাসীর মধ্যে।
নগরবাসীর মতে, দীর্ঘদিন পর তারা এমন একটি বর্ষা দেখছে, যেখানে বৃষ্টি হলেও আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে পানি জমে থাকছে না। বরং অনেক এলাকায় বৃষ্টির কিছু সময়ের মধ্যেই পানি নেমে যাচ্ছে। এতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যেমন স্বাভাবিক থাকছে, তেমনি কমেছে যানজট ও জনভোগান্তিও।
এ পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে এসেছে। সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত হকার উচ্ছেদ অভিযান, ফুটপাত ও সড়কের পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নকে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দুটি প্রকল্পে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ও উন্নয়ন করা ড্রেনেজ ব্যবস্থাও বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট শুধু পথচারীদের চলাচলেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, বরং নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। হকারদের দোকান থেকে প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া পলিথিন, প্লাস্টিক, খাবারের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের বর্জ্য ড্রেনে জমে পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দিত। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হতো।
বর্তমানে অনেক ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়েছে। নিয়মিতভাবে ড্রেন পরিষ্কার করা সম্ভব হচ্ছে এবং ড্রেনের মুখও খোলা থাকছে। এর ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হয়ে জলাবদ্ধতার মাত্রা অনেকটাই কমে এসেছে।
বিশেষ করে চাষাঢ়া, যা নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে অতীতে সামান্য বৃষ্টিতেই যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ত। একই চিত্র দেখা যেত গলাচিপা, ২নং রেলগেইট ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। এবার টানা বর্ষণের পরও এসব স্থানে আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে বৃষ্টি শুরু হলেই দোকানে ক্রেতা আসা কমে যেত। অনেক সময় দোকানে পানি ঢুকে ক্ষতির মুখেও পড়তে হতো। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমও আগের তুলনায় স্বাভাবিক রয়েছে। একইভাবে রিকশাচালক, গণপরিবহন চালক ও অফিসগামী মানুষও বলছেন, জলাবদ্ধতা কমে যাওয়ায় তাদের সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমেছে।
নগরবাসীর একটি বড় অংশ মনে করছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ড্রেন পরিষ্কার রাখা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণের কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারলে ভবিষ্যতেও জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি শহরের টেকসই উন্নয়নের জন্য উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দখলমুক্ত ফুটপাত, নাগরিক সচেতনতা এবং নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত জরুরি। এর যেকোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে আবারও জলাবদ্ধতার পুরোনো সমস্যা ফিরে আসতে পারে।
টানা বৃষ্টির মধ্যেও জলাবদ্ধতা তুলনামূলক কম থাকায় নতুন আশার আলো দেখছেন নারায়ণগঞ্জের মানুষ। তাদের বিশ্বাস, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং দখলমুক্ত ফুটপাত নিশ্চিত করা গেলে বর্ষা আর আতঙ্কের নাম হবে না; বরং স্বাভাবিক নগরজীবন বজায় রেখেই বৃষ্টিকে উপভোগ করা সম্ভব হবে। সেই প্রত্যাশাই এখন নগরবাসীর সবচেয়ে বড় চাওয়া।




































আপনার মতামত লিখুন :