News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

চব্বিশের ২২ জুলাই : কারফিউতে থমকে ছিল নারায়ণগঞ্জ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ১০:২৯ পিএম চব্বিশের ২২ জুলাই : কারফিউতে থমকে ছিল নারায়ণগঞ্জ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল জুলাইয়ের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় পার হওয়ার পর ২০২৪ সালের ২২ জুলাই ছিল নারায়ণগঞ্জে এক ভিন্ন বাস্তবতার দিন। ১৯ ও ২০ জুলাইয়ের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং প্রাণহানির পর পুরো জেলাজুড়ে নেমে আসে থমথমে পরিস্থিতি। সেদিন নতুন করে বড় ধরনের সংঘর্ষ না হলেও শহরজুড়ে ছিল সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের কঠোর অবস্থান, চলছিল কারফিউ, চেকপোস্ট, তল্লাশি ও ধরপাকড়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, শিমরাইল, মৌচাক, সানারপাড় সাইনবোর্ড, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা, সোনারগাঁ ও বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। মানুষের চলাচল ছিল সীমিত, অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল এবং পুরো জেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সারাদেশে ২২ জুলাই চিরুনি অভিযান ও ব্যাপক গ্রেপ্তার কার্যক্রম শুরু হয়, যার প্রভাব নারায়ণগঞ্জেও পড়ে।

১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সহিংসতার ভয়াবহতা তখনও মানুষের মনে তাজা। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত বহু মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা স্বজন হারানোর শোক সামলাতে ব্যস্ত, অন্যদিকে আহতদের স্বজনরা হাসপাতাল ও বাসার মধ্যে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক পর্যন্ত আতঙ্কের ছাপ ছিল স্পষ্ট। ২২ জুলাই কারফিউ বলবৎ থাকায় অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে সাহস পাননি। বিভিন্ন মোড়ে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালান এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।  

এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নারায়ণগঞ্জেও আগের কয়েক দিনের সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এবং নাশকতার অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পোড়া যানবাহন, ভাঙচুরের চিহ্ন এবং আগের সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন তখনও স্পষ্ট ছিল। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে আলোচনা করছিলেন ১৯ জুলাইয়ের গুলিবর্ষণ, প্রাণহানি ও সহিংসতার বিষয়গুলো নিয়ে। বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছিল সবচেয়ে বেশি।

এসময় ইন্টারনেট সেবা কার্যত বন্ধ থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। সংবাদ আদান-প্রদান, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যবসা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা স্থবির হয়ে যায়। অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজ নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। রাজনৈতিকভাবেও দিনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের সমন্বয়করা সহিংসতা, গ্রেপ্তার এবং কারফিউ প্রত্যাহারের দাবি জানাতে থাকেন। অন্যদিকে সরকার নাশকতা দমনে কঠোর অবস্থান বজায় রাখে এবং দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান চালানোর ঘোষণা কার্যকর করে। এর প্রভাব নারায়ণগঞ্জেও সরাসরি অনুভূত হয়।  

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, ২২ জুলাই ছিল মূলত রক্তাক্ত সংঘর্ষ-পরবর্তী এক শ্বাসরুদ্ধকর দিন। গুলির শব্দ না থাকলেও ভয়, অনিশ্চয়তা, গ্রেপ্তারের আতঙ্ক এবং স্বজন হারানোর বেদনা পুরো জেলাজুড়ে বিরাজ করছিল। পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন তদন্ত, সংবাদ প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে যে, নারায়ণগঞ্জ ছিল আন্দোলনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত জেলা। ১৯ জুলাইয়ের সহিংসতার পর ২২ জুলাইয়ের এই কারফিউ ঘেরা দিনটি ছিল সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের পরবর্তী নীরব কিন্তু গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।