বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের বিভিন্ন অপকর্ম নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিতেন তৎ সময়ের সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। শহরে ফুটপাত দখল, অটো রিকশার স্টিকার, খুন, জবরদখল নিয়ে আইভী ছিলেন একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। নিয়মিত তাঁর বক্তব্যের কারণে তিনি তখন হয়ে উঠেন আস্থার প্রতীক যে কারণে ২০০৩ সালে পৌরসভা ও পরে ২০১১, ২০১৬ ও ২০২২ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাঁর ধারে কাছে কেউ ভীড়তে পারেনি। নগরবাসী বার বার বিপরীতে থাকা আইভীকে জয়ী করে মেয়র বানিয়ে শহরের উন্নয়ন আর ওসমানদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সাহসের প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলেন। চব্বিশের পট পরিবর্তনের পর যখন আইভী কারাগারে যান তখন গত ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের আগে আরেক প্রতিবাদীর উত্থান ঘটে। এনসিপির নেতা আবদুল্লাহ আল আমিন হয়ে উঠেন সন্ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে এক জলন্ত প্রতীক। আর সেই লড়াইয়ের কারণেই তিনি জিতে যান বিপুল ভোটে। তার সংসদেও তিনি কড়া ভাষায় বক্তব্য দিয়ে আসছেন। স্থানীয় পর্যায়েও আল আমিন প্রতিবাদকারীর এক দৃষ্টান্ত।
নির্বাচনের আগে তিনি ফতুল্লার সন্ত্রাস নিয়ে আলোচনায় আসেন। ফতুল্লা বিএনপির নেতাকর্মীরা সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজদের লালন করছেন অভিযোগ করে আসছিলেন। ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বি জমিয়তের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমীর আশেপাশে থাকা আওয়ামী লীগ ঘেঁষা, বিতর্কিত লোকজনদের নিয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। কাশীপুরে মাদকের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখায় সেখানে তাঁর উপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
ভোটের আগে গত বছরের ৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের শিল্পকলা একাডেমীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘দেখলাম একজন স্টেজে এসে ছাত্ররা কীভাবে পড়ালেখা করবে, রেজাল্ট ভালো করবে, ওই পরামর্শ দিচ্ছেন; যে ব্যক্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার মিটিংয়ে উপস্থিত হয়ে কীভাবে ছাত্রদের আন্দোলন দমন করতে হবে, সেই অনুরোধ করেছিলেন। আন্দোলন চলাকালীন শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে সে ছাত্রদের দমনের ব্যাপারে বলেছে। তাকে আমরা এই স্পেস দিতে পারি না।
চলতি বছরের ৩ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্প নগরী এলাকায় জামায়াতের একটি ইফতার মাহফিলে উপস্থিত হয়ে মোহাম্মদ হাতেমের সাথে একই মঞ্চে বসতে রাজি হননি এনসিপি থেকে নির্বাচিত এমপি আবদুল্লাহ আল আমিন। এসময় তিনি তাকে ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দেন। ঘটনার পরপরেই হাতেম উঠে বেরিয়ে যান এবং তার লোকজন ও ব্যবসায়ীদের জড়ো করে আল আমিনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। প্রায় ২ ঘন্টা অবরুদ্ধ থাকার পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে এমপিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এসময় এনসিপির কয়েকজন কর্মী বিএনপি নেতা রাসেল ও তার অনুসারীদের হাতে হামলার শিকার হয়ে আহত হন।
সবশেষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, ‘আমাদের বলা হয় প্রশাসন আসামীদের দেখে না। এটা ভুল, আসামীরা চোখের সামনে আছে। কারা ওসমানদের সাথে ছিলো আমরা কি তাদের চিনি না? ওসমানদের ক্যাশিয়ার কে? শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে জুলাই অভ্যুত্থানকে তান্ডব বলেছে, সেই হাতেম ব্যবসায়ী নেতা হওয়ায় তার নাম বলা যাবে না? অথচ হাতেমের বিরুদ্ধেও মামলা আছে। আমি কোন দলের বিরুদ্ধে বা বর্গের বিরুদ্ধে না। ব্যবসায়ীদের সাথে আমাদের কোন সমস্যা নেই। নারায়ণগঞ্জকে দেশে বিদেশে সম্মানিত করেছে ব্যবসায়ীরা। তার মানে তো এই না যে কোন ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের সাথে আঁতাত করে নাই। সেলিম ওসমানও তো ব্যবসায়ী। সে অবশ্যই সন্ত্রাসী এবং ফ্যাসিস্ট। যখন আমাদের নারায়ণগঞ্জে একের পর এক গুলি করে তরুনদের হত্যা করা হচ্ছে। তখন শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে ‘যারা তান্ডব করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন’ সে এখন ব্যবসায়ী নেতা বলে তাকে ছাড় দিতে হবে?’
এই বক্তব্যের পর আবারও আলোচনা তৈরী হয় জেলাজুড়ে। হাতেমের অনুসারীরা এমপির সমালোচনা শুরু করেন। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়া জুলাই যোদ্ধাদের বড় অংশই এমপির এই বক্তব্যকে সমর্থন করতে দেখা গেছে। অর্থ্যাৎ পাল্টাপাল্টি এবং মিশ্র অবস্থান তৈরী হয়েছে হাতেম এবং এমপি আল আমিনকে নিয়ে।
সেখানে কুতুবপুরের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুকে নিয়েও কথা বলেন আল আমিন। তিনি বলেন, যারা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন কিংবা আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতেই হবে। আদালতে আত্মসমর্পণ, জামিন গ্রহণ এবং আইনের বিধান মেনেই তাদের চলতে হবে। কোনো ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে বা রাজনৈতিক পরিচয় বদলে দায় এড়াতে পারবেন না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই অবস্থানকেই আরও স্পষ্ট করেছে। এতে রাজনৈতিক মহলে এমন ধারণা জোরালো হয়েছে যে, অতীতের বিতর্কিত ভূমিকা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা নেতাদের বিষয়ে এনসিপি অন্তত প্রকাশ্যে নমনীয় অবস্থান নিতে চাইছে না। আর সেই বাস্তবতায় শামীম ওসমানের একসময়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মনিরুল ইসলাম সেন্টুকে নিয়েও নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।







































আপনার মতামত লিখুন :