News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

কারফিউর ছায়ায় থমকে থাকা ভয়ের নগরী


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:১০ পিএম কারফিউর ছায়ায় থমকে থাকা ভয়ের নগরী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে ২৩ জুলাই ছিল নারায়ণগঞ্জের জন্য এক ভিন্ন বাস্তবতার দিন। এর আগে টানা সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, প্রাণহানি ও ব্যাপক ধরপাকড়ের পর জেলার সর্বত্র তখন বিরাজ করছিল আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও থমথমে পরিস্থিতি। রাজপথে আগের মতো বড় মিছিল না থাকলেও আন্দোলনের উত্তাপ তখনো নিভে যায়নি। বরং কারফিউ, সেনাবাহিনীর টহল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও আন্দোলনের চেতনা নীরবে ছড়িয়ে পড়ছিল মানুষের মধ্যে।

২৩ জুলাই সকালে কারফিউ আংশিক শিথিল হওয়ায় মানুষ প্রয়োজনীয় কাজে ঘর থেকে বের হতে শুরু করেন। সরকারি অফিস সীমিত সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ব্যাংক ও কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু করে। তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, বঙ্গবন্ধু সড়ক, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, শিমরাইল, সাইনবোর্ড, মৌচাক ও সিদ্ধিরগঞ্জের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক দিনের চিত্র ছিল না। মানুষের চলাচল ছিল কম, দোকানপাটের বড় অংশ বন্ধ এবং রাস্তাজুড়ে ছিল সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি। আগের কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জে বহু মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অনেক পরিবার তখনো জানত না তাদের স্বজন কোথায় আছেন। কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, কেউ গ্রেপ্তার, আবার কেউ আত্মগোপনে। আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ নিজেদের বাসায় ফিরতে সাহস পাচ্ছিলেন না। বিভিন্ন এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কিংবা পরিচিতজনের কাছে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।  

সেই সময় মোবাইল ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও সীমিতভাবে ফিরতে শুরু করেছিল পরীক্ষামূলকভাবে। ফলে আন্দোলনের খবর, আহত-নিহতের তথ্য কিংবা স্বজনদের খোঁজ নিতে মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়ছিল, ২৩ জুলাই সেই প্রবাহ প্রায় থেমে যায়। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। ফতুল্লা, বিসিক, সিদ্ধিরগঞ্জ ও রূপগঞ্জ এলাকার বহু কারখানায় শ্রমিক উপস্থিতি কমে যায়। কোথাও উৎপাদন সীমিত আকারে চললেও শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল প্রবল। অনেক মালিকও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২৩ জুলাইও জেলার বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার রাখে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হয় এবং আগের সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান অব্যাহত থাকে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে প্রকাশ্যে বের হননি।

এদিকে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আগের সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসা চলছিল। অনেক পরিবারের সদস্য হাসপাতালে অবস্থান করছিলেন। কেউ কেউ আবার আহত স্বজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার চেষ্টা করেন।  ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল ছিল। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বাসায় অবস্থান করছিলেন। তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন বলে পরে বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীর বর্ণনায় উঠে আসে। সেদিন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে মানুষের মুখের ভাষাহীন উদ্বেগ। চায়ের দোকান, অলিগলি কিংবা বাসাবাড়িতে একটাই আলোচনা গত কয়েক দিনের সহিংসতা, নিহতদের খবর এবং সামনে কী হতে পারে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছিলেন না, কিন্তু ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা ছিল সর্বত্র।

২৩ জুলাই তাই নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে বড় কোনো সংঘর্ষের দিন না হলেও, এটি ছিল ভয়, শোক, অনিশ্চয়তা এবং নীরব প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যে দিন মানুষ রাস্তায় কম ছিল, কিন্তু প্রতিবাদের আগুন তখনও নিভে যায়নি।