রাজধানী ঢাকার একেবারে পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। শিল্প, বাণিজ্য, নদীবন্দর ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহর। রাজধানীর সঙ্গে প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত। অথচ নগরজীবনের মৌলিক সুবিধার প্রশ্নে এখনো নানা সংকটে ভুগতে হচ্ছে নারায়ণগঞ্জবাসীকে। সড়ক, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, নিরাপদ পানি, ফুটপাত প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে দীর্ঘদিনের সমস্যা।
নগরবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসছে না। কোথাও সড়ক নির্মাণের পর আবার ড্রেনের কাজ, কোথাও ড্রেন থাকলেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কার্যকর নয়। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। নারায়ণগঞ্জের অন্যতম বড় নাগরিক সমস্যা যানজট। শহরের প্রধান সড়ক, বাজারকেন্দ্রিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল ও সংযোগ সড়কগুলোতে দিনের বিভিন্ন সময়ে যানবাহনের চাপ বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত যাত্রী ওঠানামা এবং সড়কের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ। ফলে স্বল্প দূরত্ব পাড়ি দিতেও অনেক সময় অতিরিক্ত সময় লাগে। শিল্পনগরী হিসেবে নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির বড় অংশই পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যানজট শুধু মানুষের সময় নষ্ট করছে না, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
জলাবদ্ধতা নারায়ণগঞ্জের পুরোনো সমস্যা। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার হলেও অনেক জায়গায় পানি জমে থাকার অভিযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের নথিতে বলা হয়েছে, অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ সুবিধা না থাকায় বৃষ্টির পানি ঠিকমতো বের হতে পারে না। আবার বিদ্যমান ড্রেনের কিছু অংশে বর্জ্য ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা পানি নিষ্কাশনে বাধা তৈরি করে।
নগরের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। জনসংখ্যা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থায়ী ডাম্পিং ব্যবস্থা এবং বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর কাঠামো না থাকলে পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলা কঠিন। চলতি অর্থবছরের জন্য সিটি করপোরেশন রেকর্ড পরিমাণ বাজেট ঘোষণা করেছে। এতে সড়ক ও ড্রেন, নিরাপদ পানি, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও যানজট কমানোর মতো খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পানি ও নাগরিক অবকাঠামোতেও ঘাটতিনগরের একটি আধুনিক শহরে নিরাপদ পানি, পর্যাপ্ত ড্রেন, ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ ও গণপরিসর মৌলিক নাগরিক সুবিধার অংশ। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের অনেক এলাকায় এসব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণেই নগরবাসীর প্রত্যাশা শুধু নতুন রাস্তা বা ভবন নির্মাণ নয়, বরং পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা। এডিবির ২০২৬ সালের নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পেও নিরাপদ পানি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা কমানো এবং সবুজ গণপরিসর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ ও একাধিক অবকাঠামোগত পরিকল্পনার কথা এসেছে। এর মধ্যে পানি সরবরাহের পাইপলাইন, ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার, স্মার্ট পানি সংযোগ, পার্ক ও খেলার মাঠ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং যানজট নিরসনের উদ্যোগ রয়েছে। তবে একটি শহরের উন্নয়ন শুধু বাজেটের আকার দিয়ে মাপা যায় না। মানুষ কত সহজে বাসা থেকে কর্মস্থলে যেতে পারছে, বৃষ্টির পর কত দ্রুত পানি সরে যাচ্ছে, রাস্তা কতটা নিরাপদ, ফুটপাত দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারছে কি না, বর্জ্য সময়মতো অপসারণ হচ্ছে কি না এসবই নাগরিক উন্নয়নের বাস্তব সূচক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারায়ণগঞ্জের মূল সমস্যা শুধু অর্থের অভাব নয়, বরং নগর পরিকল্পনা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। শহরের এক সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করছে, অন্য সংস্থা পানি বা গ্যাসের লাইন বসাতে রাস্তা কাটছে এ ধরনের সমন্বয়হীনতা থাকলে নতুন অবকাঠামোও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, খাল-জলাশয় সংকুচিত হওয়া এবং জনসংখ্যার চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ঢাকার পাশের শহর হিসেবে নারায়ণগঞ্জের সম্ভাবনা অনেক। শিল্প ও বাণিজ্যের পাশাপাশি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে এটি রাজধানীর ওপর চাপ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে মৌলিক নাগরিক সুবিধা।
এদিকে ঢাকার পাশে থেকেও নাগরিক সুবিধায় পিছিয়ে থাকার এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে প্রকল্পের সংখ্যা নয়, সমন্বিত পরিকল্পনা, জবাবদিহি, সঠিক বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাহলেই নারায়ণগঞ্জ একটি আধুনিক ও বসবাসযোগ্য নগরে পরিণত হবে।




































আপনার মতামত লিখুন :