নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় সরব উপস্থিতি, সভা-সমাবেশে বক্তব্য আর রাজনৈতিক কর্মকা-ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এখন দেশের বাইরে। তবে সরাসরি নারায়ণগঞ্জের মাঠে না থাকলেও রাজনীতির আলোচনায় রয়েছেন তিনি। সম্প্রতি বিদেশের মাটিতে একাধিক স্থানে বক্তব্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন আওয়ামী লীগের এই সাবেক এমপি। প্রায় দুই বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি আওয়ামী লীগ কর্মীসভায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে দেখা যায় তাকে।
একসময় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের রাজনীতিতে শামীম ওসমানের উপস্থিতিই ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতির নানা সমীকরণে তাঁর অবস্থান নিয়ে আলোচনা থাকত। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মকা- এবং অনুসারীদের তৎপরতা ঘিরে প্রায়ই উত্তপ্ত হয়ে উঠত নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই দৃশ্যপট বদলে যায়। দেশের বাইরে অবস্থান নেওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর সরাসরি উপস্থিতি আর নেই। বদলে গেছে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণও। একসময় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক নেতাকর্মী এখন ভিন্ন বাস্তবতায় নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করছেন। কেউ প্রকাশ্যে সক্রিয়, কেউ রয়েছেন অনেকটা নীরবে।
তারপরও শামীম ওসমানের নাম নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক আলোচনায় বারবার ফিরে আসছে। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। দেশে না থেকেও তিনি কী বার্তা দিচ্ছেন, কার উদ্দেশে কথা বলছেন এবং তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব কতটাÑএসব প্রশ্নও উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন কোনো একটি অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা নেতার সরাসরি উপস্থিতি না থাকলেও তাঁর তৈরি রাজনৈতিক বলয় পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায় না। অনুসারী, রাজনৈতিক সম্পর্ক, অতীতের সাংগঠনিক কাঠামো এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে সেই নেতার নাম রাজনৈতিক আলোচনায় থেকে যেতে পারে। শামীম ওসমানের ক্ষেত্রেও অনেকটা এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে তাঁর অনুপস্থিতির সময়ে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামনে এসেছে। ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আগে যাঁরা তাঁর রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান খুঁজছেন। কেউ দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছেন না।
তাঁর অনুপস্থিতিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যেমন বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তেমনি বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও নতুন নেতৃত্ব ও নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফলে আগের মতো কোনো একক রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব এখন আর সহজে দৃশ্যমান নয়। তবে তাঁর বিদেশে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি আবারও প্রমাণ করছে, রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি তিনি। দেশের বাইরে থেকেও দলীয় রাজনীতি ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন। এতে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে যেমন আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরেও তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব অভিযোগ ও মামলার কারণে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। ফলে দেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন হবে কি না, হলে কবে এবং কীভাবে এসব প্রশ্নও রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, শুধু বিদেশে বক্তব্য দেওয়া আর দেশের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এক বিষয় নয়। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাব ধরে রাখতে হলে মাঠপর্যায়ের সংগঠন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকা-ে উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় শামীম ওসমানের বর্তমান অবস্থান আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তবুও নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁর নাম এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পুরোনো অনুসারীরা কোথায়, তাঁর অনুপস্থিতিতে কোন নতুন বলয় তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা কী হতে পারে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বারবার সামনে আসছে শামীম ওসমানের নাম।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে শামীম ওসমান এখন নেই, কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁর উপস্থিতি এখনো স্পষ্ট। বিদেশের মাটিতে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই আলোচনাকে আবারও উসকে দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন একটাই শামীম ওসমানের রাজনৈতিক অধ্যায় কি সত্যিই শেষ, নাকি দূর থেকেই নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।




























-20260912144331.jpg)






আপনার মতামত লিখুন :