একসময় নারায়ণগঞ্জ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিল খেলার মাঠ। বিকেল হলেই শিশু-কিশোরদের ছোটাছুটি, ফুটবল-ক্রিকেটের আয়োজন আর তরুণদের আড্ডায় মুখর হয়ে উঠত মাঠগুলো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, দখল এবং নানা কাজে মাঠ ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে খেলার জায়গা। ফলে ইট-পাথরের শহরে বেড়ে উঠছে শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ, যাদের জন্য মাঠে গিয়ে খেলাধুলার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।
নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী। মানুষের বসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বহুতল ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা। কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় উন্মুক্ত জায়গা, খেলার মাঠ ও পার্ক তৈরির পরিকল্পনা সেই অনুপাতে এগোয়নি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আগে যে খোলা জায়গা ছিল, তার অনেকটাই এখন বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নগরীর অন্যতম বড় সমস্যা হলো শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠের সংকট। অনেক এলাকায় স্কুল-কলেজের নিজস্ব মাঠ থাকলেও সেগুলোর সবগুলো নিয়মিতভাবে খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত নয়। কোথাও মাঠে নির্মাণসামগ্রী রাখা হচ্ছে, কোথাও নানা অনুষ্ঠান বা মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো মাঠ দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ফলে অনেক শিশু-কিশোরকে রাস্তা, গলি কিংবা ভবনের ছাদে খেলাধুলা করতে দেখা যায়। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সন্তানদের মোবাইল ফোন ও অনলাইনভিত্তিক বিনোদন থেকে দূরে রেখে খেলাধুলায় আগ্রহী করতে চাইলেও পর্যাপ্ত মাঠ না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। একটি মাঠে একসঙ্গে অনেক শিশু খেলতে পারে, বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারে এবং দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু মাঠের অভাবে সেই সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশুদের একটি বড় অংশ ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে।
শুধু শিশু-কিশোর নয়, তরুণদের জন্যও মাঠের সংকট তৈরি হয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় আগ্রহী তরুণদের অনেকেই নিয়মিত অনুশীলনের জায়গা পান না। ফলে প্রতিভা থাকলেও অনেক খেলোয়াড় নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন ক্রীড়া একাডেমি ও ক্লাব থাকলেও তাদের বড় একটি সমস্যা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। মাঠের স্বল্পতা, অনুশীলনের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা এবং অর্থ সংকটের কারণে অনেক সংগঠন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। এতে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় তৈরি হলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিকল্পিত নগরীতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনার পাশাপাশি খেলার মাঠ, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদনকেন্দ্র থাকা জরুরি। কারণ মাঠ শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়, এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ এবং সুস্থ জীবনযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নগর পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিলে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন আবাসিক এলাকা কিংবা স্থাপনা নির্মাণের সময় খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখা এবং বিদ্যমান মাঠগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।
নগরবাসীর দাবি, যেসব মাঠ এখনো রয়েছে সেগুলোকে দখল ও অপরিকল্পিত ব্যবহার থেকে রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত সরকারি জমি চিহ্নিত করে সেখানে মাঠ ও পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন শুধু নতুন সড়ক, ভবন কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একটি বাসযোগ্য নগরীর জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ।








































আপনার মতামত লিখুন :