২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট ছিল নারায়ণগঞ্জের জন্য এক নতুন বাস্তবতার দিন। টানা কয়েক সপ্তাহের আন্দোলন, সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, প্রাণহানি ও আতঙ্কের পর এদিন জেলার মানুষ একদিকে যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক শূন্যতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এদিন সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া, দুই নম্বর রেলগেট, বঙ্গবন্ধু সড়ক, ম-লপাড়া, ডিআইটি, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ধীরে ধীরে শুরু হয়। কয়েক দিন ধরে বন্ধ থাকা অধিকাংশ দোকানপাট খুলতে শুরু করে। তবে সর্বত্রই ছিল সতর্কতা এবং উদ্বেগ।
এদিন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল পুলিশের অনুপস্থিতি। জেলার অধিকাংশ থানায় নিয়মিত পুলিশি কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক থানায় সদস্যরা নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্মস্থলে ছিলেন না। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সরকারি স্থাপনা, আদালত এলাকা এবং শিল্পাঞ্চলে সেনাসদস্যদের টহল মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করে।
গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের আবহে বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজয় মিছিল বের করেন। আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ, আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায় নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চাষাঢ়া ও আশপাশের এলাকা। অনেকেই জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামেন। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নীরবতা পালন করেন।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে শুরু হয় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা ইট, বাঁশ, ব্যারিকেডের অবশিষ্টাংশ ও ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে সড়ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেন। আন্দোলনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত দেয়ালগুলোতে নতুন করে দেশপ্রেম, গণঅভ্যুত্থান এবং বৈষম্যবিরোধী বিভিন্ন গ্রাফিতিও আঁকা শুরু হয়।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়। ফতুল্লা, বিসিক শিল্পনগরী, কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ ও রূপগঞ্জের অনেক কারখানার মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উৎপাদন চালুর প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান সীমিত আকারে কার্যক্রম পরিচালনা করে। আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা দিনভর বিভিন্ন এলাকায় যান। তারা আহতদের চিকিৎসা, নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন। জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজনও করা হয়।
অন্যদিকে, জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত ভবন, বিদ্যুৎ অফিস, গ্যাস অফিস, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক এবং অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। কোথাও যাতে নাশকতা বা লুটপাট না ঘটে, সেজন্য প্রশাসন বিশেষ নজরদারি চালায়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও দেখা যায় নতুন সমীকরণ। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন। তবে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশের পরিবর্তে অধিকাংশ দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সংগঠন পুনর্গঠনের কাজেই মনোযোগ দেয়।
তবে স্বস্তির পাশাপাশি উদ্বেগও ছিল স্পষ্ট। আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি মিলবে কি না, আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন কীভাবে হবে এসব প্রশ্ন মানুষের আলোচনায় উঠে আসে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও পুলিশকে দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার দাবিও জোরালো হতে থাকে।
৬ আগস্ট ছিল দীর্ঘ আন্দোলনের পর নতুন রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় প্রবেশের প্রথম দিন। রাজপথের উত্তেজনার জায়গা নেয় পুনর্গঠনের আলোচনা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা। কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর এই দিনটি নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে একদিকে স্বস্তির, অন্যদিকে নতুন অনিশ্চয়তার সূচনালগ্ন হিসেবে।

































আপনার মতামত লিখুন :