নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের বিরোধ এবার দলের অভ্যন্তরেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আদালত ভবনে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা, বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনার পর এবার বিষয়টি নিয়ে দলীয় পর্যায়ে শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবীদের মধ্যে চলা বিরোধ নতুন করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সবশেষ নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি হাতাহাতিতে গড়ায়। ঘটনায় একজন আইনজীবী আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময় আদালতপাড়ায় উপস্থিত বিএনপির নেতাকর্মী ও আইনজীবীদের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে দলীয় পরিচয়ে থাকা আইনজীবীদের প্রকাশ্য বিরোধ সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। কারণ, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাÐের অন্যতম একটি কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ঘটনার পর বিষয়টি আর শুধু আইনজীবীদের ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিরোধ হিসেবে থাকেনি। দলের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এরই মধ্যে বিরোধে জড়িত দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির দ্বিতীয় তলায় সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের কক্ষে প্রবেশ করেন মহানগর বিএনপির আহŸায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এ সময় সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধান, নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, মহানগর বিএনপির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ আঞ্জুম আহমেদ রিফাত এবং জেলা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়নসহ আরও পাঁচ থেকে ছয়জন তাঁর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নোটিশে দাবি করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সাখাওয়াত হোসেন খানকে উদ্দেশ করে অশালীন ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেন। এ ধরনের আচরণের কারণ জানতে চাইলে তাঁরা তাঁর প্রতি মারমুখী হয়ে ওঠেন।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য বিরোধ এড়িয়ে চলার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার যে চেষ্টা চলছে, তার মধ্যে প্রকাশ্যে এমন বিরোধ দলের ভাবমূর্তির জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে এখন একদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তার ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা হিসাব চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আদালতপাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় দলীয় পরিচয়ে থাকা নেতাদের বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
তবে এই বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপির বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি। বরং সা¤প্রতিক ঘটনাকে দলের ভেতরে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা নিয়ে টানাপোড়েনের একটি প্রকাশ্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে আইনজীবীদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি, মামলা পরিচালনা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তায় তাদের ভ‚মিকা রয়েছে। ফলে আইনজীবীদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব দলীয় কর্মকাণ্ডে ও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে শোকজের ঘটনায় বিএনপির তৃণমূলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে সাংগঠনিক প্রদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সব মিলিয়ে আদালতপাড়ার সা¤প্রতিক ঘটনা এখন আর শুধু দুই পক্ষের আইনজীবীদের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি গড়িয়েছে বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রশ্নেও। দলীয় নেতৃত্ব কীভাবে বিষয়টি সামাল দেয় এবং বিরোধে জড়িতদের অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়ায়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে এর পরবর্তী প্রভাব।
































আপনার মতামত লিখুন :