প্রকৃতি আজ যেন নীরব ভাষায় আমাদের সতর্ক করছে। কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, কোথাও অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা। জলবায়ুর এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব থেকে কেউই রক্ষা পায় না। এমন বাস্তবতার মধ্যেই এসেছে ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে দিবসটি উদযাপিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতিই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক এবং জলবায়ু রক্ষা করাই আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পাহাড় কাটা, নদী ও জলাশয় দখল এবং বর্জ্য দূষণের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং জীববৈচিত্র ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
বন উজাড়ের ফলে বায়ুুমÐলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে চলেছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিও বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে সৃষ্ট এই জলবায়ুুগত ঘটনা পৃথিবীর আবহাওয়াকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব যত তীব্র হয়, ততই বাড়তে থাকে বন্যা, খরা, দাবদাহ ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষি, পানি সরবরাহ, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের জীবিকায়।
এই সংকট কেবল দূর দেশের কোনো গল্প নয়; এর প্রভাব আমাদের আশপাশেও স্পষ্ট। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। একসময় যে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও জনজীবন, আজ সেই নদী দূষণের ভারে প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী। শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণ প্রতিনিয়ত শীতলক্ষ্যার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিসিক শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ায় পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্তে¡ও অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার বিধান যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। একই সঙ্গে জলাশয় ভরাট, সবুজায়ন হ্রাস এবং নগরায়নের চাপ শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে, যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তির ভূমিকাকে কখনোই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বেশি করে গাছ লাগানো এবং লাগানো গাছের পরিচর্যা করা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করা, বর্জ্য আলাদা করে ব্যবস্থাপনা করা, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা এসব ছোট ছোট উদ্যোগই সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি।
পরিবেশ রক্ষা কেবল সরকার বা নীতিনির্ধারকদের একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার নৈতিক অঙ্গীকার। প্রকৃতি আমাদের শিখিয়েছে, ভারসাম্য নষ্ট হলে বিপর্যয় অনিবার্য। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক শুধু একটি গাছ লাগানো নয়, একটি গাছ বাঁচানো; শুধু সচেতনতা নয়, কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। কারণ প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।


































-20260603135648.jpg)





আপনার মতামত লিখুন :