একসময় ইউরোপীয় পর্যটকরা শীতলক্ষ্যা নদীর স্বচ্ছ পানি দেখে মুগ্ধ হয়ে একে হীরার সঙ্গে তুলনা করতেন। শুধু নামেই নয়, গুণেও এই নদী ছিল শীতল ও নির্মল। বিশ্বখ্যাত মসলিন তৈরির পেছনেও এই নদীর পানির বিশেষ ভূমিকার কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
এই নদীর তীর ঘিরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ সোনারগাঁও। মুঘল আমলের হাজীগঞ্জ দুর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ এবং পানাম নগর সবই এই নদীকেন্দ্রিক ইতিহাসের অংশ।
পরবর্তীতে পাটশিল্পের বিকাশের সঙ্গে শীতলক্ষ্যা হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জের বাণিজ্য ও শিল্পের প্রধান জলপথ। এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে কলকারখানা, নৌবন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার। সেই সময় নারায়ণগঞ্জ পরিচিতি পায় “প্রাচ্যের ডান্ডি” হিসেবে। কিন্তু আজ সেই নদী দূষণ, নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বছরের পর বছর অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, দুর্বল তদারকি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে শীতলক্ষ্যার বর্তমান এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে প্রায় তিন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। টেক্সটাইল, ডাইং, কাগজকলসহ বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীতে পড়ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এর ভয়াবহতা আবারও সামনে আসে। বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার ঘটনায় পলাশ বাজার থেকে চরসিন্দুর পর্যন্ত এলাকায় প্রায় ৫০ টন মাছ মারা যায়। বড় ক্ষতির মুখে পড়েন স্থানীয় জেলে ও মাছ চাষিরা। যে নদী একসময় হাজারো পরিবারের জীবিকার উৎস ছিল, সেই নদী এখন অনেকের জন্য দুর্ভোগের কারণ।
চলতি বছরের মার্চে হাইকোর্ট শীতলক্ষ্যার তীরে ইটিপি ছাড়া পরিচালিত ২০টি কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন এবং ৩০ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, আগের নির্দেশগুলোর মতো এটিও কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা।
দূষণের পাশাপাশি শীতলক্ষ্যাকে ঘিরে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো অপরাধ। ২০১৩ সালের মার্চে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খালে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর লাশ ভেসে ওঠে। এই ঘটনা তখন আলোচিত হলেও নদীকে কেন্দ্র করে অপরাধের ধারা থামেনি।
এর এক বছর পর, ২০১৪ সালের আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলার ঘটনায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা করা হয় এবং পরে তাদের মরদেহ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর লাশগুলো ভেসে উঠলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই শীতলক্ষ্যা থেকে দুটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের বরফকল ঘাট এলাকা থেকে নৌ-পুলিশ এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। এর দুই সপ্তাহ পর, ১৯ এপ্রিল বন্দর উপজেলার ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি সংলগ্ন নদীতীর থেকে আরেকটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়। ফেব্রুয়ারিতেও গাজীপুর অংশে একটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা বলছে, নদীকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
অথচ এই নদীর ভবিষ্যৎ ভিন্ন হতে পারত। সোনারগাঁও, পানাম নগর, হাজীগঞ্জ দুর্গ এবং সোনাকান্দা দুর্গকে ঘিরে সহজেই নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে উঠতে পারত। নৌভ্রমণ, ঐতিহ্যভিত্তিক ট্যুর এবং নদীতীর উন্নয়নত্মসব মিলিয়ে শীতলক্ষ্যা ঢাকার কাছাকাছি একটি বড় পর্যটন গন্তব্য হতে পারত। কিন্তু দূষণ, দখল এবং নিরাপত্তার অভাব সেই সম্ভাবনাকে পিছিয়ে দিয়েছে।শীতলক্ষ্যাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয় বরং জরুরি।
শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধন নিশ্চিত করতে হবে, আইন না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, নদীতীর দখলমুক্ত রাখতে হবে এবং নদীপথে নজরদারি বাড়াতে হবে। তবে এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় শিল্পমালিক, স্থানীয় মানুষ, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
হাইকোর্টের নির্দেশ একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সেটি বাস্তব পরিবর্তন আনে কিনা।
যে নদীর পানিতে একসময় মসলিনের সুতো ভিজত, সেই নদী আজ সংকটের প্রতীক; এই বাস্তবতা বদলানোর এখনই সময়।









































আপনার মতামত লিখুন :