News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩

ইট ভেঙ্গে চলছে একাকী জীবনযুদ্ধের সংগ্রাম


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: মে ৮, ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম ইট ভেঙ্গে চলছে একাকী জীবনযুদ্ধের সংগ্রাম

পাঁচ তলা ভবনের ভাঙা ইটের স্তূপ। তার পাশেই মাটিতে পাতা পুরোনো বস্তা। তারই উপর বসে ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক ইট ভাঙছেন ক্ষীণদেহী বৃদ্ধা আনোয়ারা। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। কাঁপা হাত, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। মাঝ আকাশে মাথার উপর সূর্য্য ছড়াচ্ছে খরতাপ। তবে সেই খরতাপ উপেক্ষা করেই কাঁপা হাতে একের পরে এক হাতুড়ির আঘাতে ইট ভেঙ্গে যাচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সেও এই হাতুড়ি দিয়ে ইট ভেঙ্গে চলছে আনোয়ারার একাকী জীবনযুদ্ধের সংগ্রাম। বয়স ৭০ পেরুলেও  বয়স্ক ভাতাসহ কোন ধরনের সরকারি সুবিধা পাননি বৃদ্ধা আনোয়ারা।

আনোয়ারা বেগমের গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই গ্রামে। নিজের চাচাতো ভাই রেফাজউদ্দীন ভূঁইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তিস্তা নদীর ভাঙনে একসময় হারিয়ে যায় তাদের সহায়-সম্পদ। পরে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসে মিরপুরে থাকতেন। প্রথমে রিকশা চালাতেন তার স্বামী। পরে ২০০০ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন তারা। স্বামী লেবারের কাজ করতেন, রিকশাও চালাতেন। অল্প আয়ে কষ্ট হলেও ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু ২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রেফাজউদ্দীন। ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে তার খাদ্যনালী। চিকিৎসা করাতে গিয়ে যা ছিল সব ফুরিয়ে যায়। একসময় বিছানায় পড়ে যান তিনি। স্বামীর চিকিৎসা আর সংসার চালাতে তখনই ইট ভাঙার কাজ শুরু করেন আনোয়ারা বেগম। চার বছর অসুস্থ থাকার পর ২০১২ সালে মারা যান রেফাজউদ্দীন ভূঁইয়া। তাদের সংসারে দুই সন্তান জন্ম নিলেও জন্মের কিছুদিন পরেই মারা যায়।

স্বামী মারা যাওয়ার পরেই শুরু হয় আনোয়ারার একাকী জীবনযুদ্ধের সংগ্রাম। এরপর ইট ভাঙাই হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কয়েক বছর ভাইয়ের সঙ্গে থেকেছেন। কিন্তু ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর সেখান থেকেও আলাদা হয়ে যান। এরপর পাইনাদীতে খালি জায়গায় ছাপড়া ঘর তুলে কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন আনোয়ারা। পাইনাদী ১০তলা এলাকায় গোলাম রাব্বানীর স্ত্রী তাকে নিজেদের বাড়িতে থাকার জায়গা দেন। প্রায় আট বছর ধরে গোলাম রাব্বানীর বাড়ির একটি কক্ষে একাই থাকেন তিনি। ঘর গোছানো থেকে শুরু করে রান্না আর বহুতল ভবনের সিড়ি বেয়ে ইট ভাঙ্গার কাজ সবকিছুই করতে হচ্ছে নিজ হাতে।       

আনোয়ারা বেগম জানান, ‘এহন বেশি কাম করতে পারি না। টুকটাক কাম কইরা যা পাই, ওই দিয়া খাবার ওষুধ কিনি’। তিনি বলেন, বাড়িওয়ালা রব্বানী সাহেব প্রতি মাসে চাইল কিন্না দেয়। মাঝেমধ্যে মাছও দেয় ওইগুলা খাই। আশেপাশে শাক টুকাই। মাঝেমধ্যে আশেপাশের কেউ সহযোগিতা করে। ঈদের আগে অনেকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করে। তিনি আরো জানান, আলসারসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। কিছুদিন আগে অসুস্থ হলে তখন তার ভাই তাকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ওই পয্যন্তই। তিনি বলেন, ভাই বোন আত্মীয় স্বজন কেউই দেহেনা মরার মতো এহানে পইরা থাকি।’

আনোয়ারা জানান, ২০০৮ সালে ভোটার হয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই ভোটার স্লিপ হারিয়ে গেছে। পরে স্বামীর অসুস্থতা আর দারিদ্র্যের চাপে আর তোলা হয়নি সেই এনআইডি কার্ড। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি কার্ড) না থাকায় সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা পাননি। কয়েকজনের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে কোন সহযোগিতা করতে পারেনি। আইডি কার্ড না থাকায় বয়স্ক ভাতাসহ সরকারি কোন সুযোগ সুবিধাও পাননি।

তিনি বলেন, এহন পর‌্যন্ত সরকারিভাবে চারআনা পয়সাও সহযোগিতা পাইনি। যতদিন আল্লাহ বাচিয়ে রাখবে কর্ম করে খেতে চাই। আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা যাতে মৃত্যুর আগ পয্যন্ত আমাকে সুস্থ রাখে। বয়স হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তারপরও নিজের খরচ চালানোর জন্য ইট ভেঙ্গেই জীবন অতিবাহিত করতে চান।

স্থানীয়রা জানান, বৃদ্ধা আনোয়ারাকে অনেক বছর ধরেই দেখছি। বয়স হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তারপরও নিজের খরচ চালানোর জন্য ইট ভাঙেন। আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করি। একজন বৃদ্ধ নারী এই বয়সে ইট ভেঙে জীবন চালাচ্ছেন, এটা সত্যিই কষ্টের।

তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট যারা রয়েছেন তারা বৃদ্ধা আনোয়ারার এনআইডি ও বয়স্ক ভাতাসহ সরকারি সুযোগ সুবিধার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন বলে তাদের প্রত্যাশা। সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এ ধরনের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।