পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে সারাদেশে যখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে, তখন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর কাছে ঈদ মানেই উদ্বেগ, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার আরেকটি সময়। রাজনৈতিক পালাবদলের পর টানা প্রায় এক বছর ধরে আত্মগোপনে থাকা বহু নেতাকর্মী এবারও পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারছেন না। কেউ অবস্থান করছেন গোপনে, কেউ দেশের বাইরে, আবার কেউ কাটাবেন ঈদের দিন কারাগারের ভেতরে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পতনের পর দলটির নেতাকর্মীদের ওপর শুরু হয় মামলা, গ্রেফতার ও রাজনৈতিক চাপের নতুন অধ্যায়। নারায়ণগঞ্জেও এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এসব মামলার পর থেকেই অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। কেউ আত্মগোপনে চলে যান রাজধানী কিংবা দেশের অন্য জেলায়, আবার কেউ নিরাপত্তার আশঙ্কায় বিদেশে অবস্থান করছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এরই মধ্যে জেলার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী এখনও বন্দি রয়েছেন। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও কারাগারে আছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজপথে সরব উপস্থিতি থাকা নেতাকর্মীদের এখন প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা যায়। দলীয় কার্যালয়গুলোতেও আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা এলেও জেলার মাঠপর্যায়ে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। গ্রেফতার ও মামলার আতঙ্কে প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে চাইছেন না অনেকেই। ফলে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ঈদের মতো ধর্মীয় ও পারিবারিক উৎসবেও স্বজনদের অনুপস্থিতি তাদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে না চাইলেও নীরবে বহন করছেন মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা।
দলটির তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী এলাকায় অবস্থান করলেও তারাও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। রাজনৈতিক কর্মকা-ের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমিত হয়ে পড়েছে তাদের উপস্থিতি। বিভিন্ন সময় অনলাইনে দলীয় অবস্থান তুলে ধরলেও বাস্তব মাঠ রাজনীতিতে তাদের সক্রিয়তা নেই বললেই চলে।
বর্তমানে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সংকটেও ভুগছে। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা নেতাকর্মীদের পুনরায় একত্রিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে সক্রিয় থাকলেও আওয়ামী লীগের পক্ষে সংগঠিতভাবে রাজনীতিতে ফেরার পথ এখনো অনিশ্চিত।
ঐতিহাসিকভাবে নারায়ণগঞ্জকে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও জন্মভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ সেই জেলাতেই এখন দলটির কার্যক্রম অনেকটাই নিস্তেজ। কিছুদিন আগেও যারা সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং কিংবা সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সরব ছিলেন, তারাই এখন আত্মগোপনে জীবন কাটাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট থেকে বের হতে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংগঠনিক পুনর্গঠন, কার্যকর নেতৃত্ব এবং সময়োপযোগী রাজনৈতিক কৌশল। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেই পথ সহজ নয় বলেই মনে করছেন তারা।































-20260522173818.jpg)





আপনার মতামত লিখুন :